রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দুপুর ১:৫৮

অফিসের ঠিকানা: ১ম তলা, আব্দুল আলী প্লাজা, প্রগতি সরণি সড়ক, যমুনা ফিউচার পার্কের আউটগেটের বিপরীতে, ঢাকা-১২২৯।

অফিসের ঠিকানা: ১ম তলা, আব্দুল আলী প্লাজা, প্রগতি সরণি সড়ক, যমুনা ফিউচার পার্কের আউটগেটের বিপরীতে, ঢাকা-১২২৯।

সর্বশেষ খবর

হামজার নতুন ঠিকানা ডার্বি হলে, লাভটা শুধু হামজার নয়।

হামজা চৌধুরীকে ঘিরে বাংলাদেশের ফুটবলে আলোচনা নতুন কিছু নয়। তবে প্রতিবার তাঁর ক্লাব-ভবিষ্যৎ সামনে এলে প্রশ্নটা শুধু থাকে না—হামজা কোথায় খেলবেন? এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, হামজার পরবর্তী ক্লাব বাংলাদেশকে কতটা উপকার করবে?

সাম্প্রতিক সময়ে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তরের ফুটবল প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাব ডার্বি কাউন্টির সঙ্গে হামজা চৌধুরীর নাম জড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, হামজাকে স্থায়ীভাবে দলে নেওয়ার বিষয়ে ডার্বির আগ্রহ রয়েছে। গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নশিপে অষ্টম স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করেছে ডার্বি কাউন্টি।

আমার চোখে, হামজার সম্ভাব্য এই ক্লাব পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ‘লেস্টার থেকে ডার্বি’ নয়। আসল প্রশ্ন হলো – হামজা কি এমন একটি পরিবেশ পাচ্ছেন, যেখানে তিনি নিয়মিত খেলতে পারবেন এবং নিজের সেরা সংস্করণটি আবারও মাঠে তুলে ধরতে পারবেন?

নাম নয়, এখন দরকার নিয়মিত খেলা – হামজার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তাঁর বহুমুখিতা। তিনি রক্ষণাত্মক মাঝমাঠে খেলতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে রক্ষণভাগের ডান পাশেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন। চ্যাম্পিয়নশিপের গতিময় ও শারীরিক ফুটবলে এই ধরনের খেলোয়াড়ের মূল্য কম নয়। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের একটি বাস্তবতাও অস্বীকার করার উপায় নেই, নিয়মিত প্রথম একাদশে থাকা সবসময় সহজ হয়নি।

লেস্টার সিটির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক হামজাকে পরিচিতি দিয়েছে, শীর্ষ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা দিয়েছে, ইংলিশ ফুটবলের বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে শুধু বড় ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকাই যথেষ্ট নয়। এখন দরকার এমন একটি জায়গা, যেখানে কোচ তাঁকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেবেন এবং ধারাবাহিকভাবে মাঠে নামাবেন। এই জায়গায় ডার্বি তাঁর জন্য ভালো একটি পুনর্গঠনের সুযোগ হতে পারে।

ডার্বি কি হামজার জন্য আদর্শ ক্লাব?
‘আদর্শ’ শব্দটি ফুটবলে খুব সহজে ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে ডার্বি কাউন্টির দলীয় কাঠামো ও প্রতিযোগিতার ধরন হামজার সামর্থ্যের সঙ্গে যথেষ্ট ভালোভাবে মিলে যায়। চ্যাম্পিয়নশিপ এমন একটি প্রতিযোগিতা, যেখানে শারীরিক সক্ষমতা, দ্বিতীয় বলের লড়াই, দ্রুত আক্রমণ-রক্ষণ পরিবর্তন, চাপ সৃষ্টি এবং কৌশলগত শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হামজার স্বাভাবিক খেলাও অনেকটা এই জায়গাগুলোতেই কার্যকর।

তিনি এমন মাঝমাঠের খেলোয়াড় নন, যাঁকে দিয়ে দলের প্রতিটি আক্রমণ তৈরি করাতে হবে। বরং তাঁর কাজ হতে পারে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া, মাঝমাঠে ভারসাম্য তৈরি করা, বল পুনরুদ্ধার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ষণে নেমে যাওয়া। অর্থাৎ ডার্বি যদি তাঁকে তাঁর শক্তির জায়গায় ব্যবহার করে, তাহলে এটি হামজার ক্যারিয়ারে এক ধাপ পিছিয়ে যাওয়া নয়; বরং আবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সঠিক জায়গায় দাঁড়ানো।

বাংলাদেশের জন্য আসল লাভ কোথায়?
এখানেই গল্পটা আরও বড়। হামজা এখন শুধু লেস্টার সিটির খেলোয়াড় নন। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তাঁর ক্লাবের প্রতিটি ম্যাচ তাই কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের ফুটবলের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একজন জাতীয় দলের খেলোয়াড় যখন নিয়মিত চ্যাম্পিয়নশিপের মতো প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে খেলেন, তখন জাতীয় দলের জন্য তাঁর ম্যাচ খেলার প্রস্তুতিও বাড়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার জন্য নিয়মিত ক্লাব ফুটবলের কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দলের ক্ষেত্রে, যেখানে একজন মানসম্পন্ন খেলোয়াড়ের উপস্থিতি পুরো দলের কাঠামোতেই প্রভাব ফেলতে পারে, সেখানে হামজার নিয়মিত খেলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হামজা যত বেশি প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলবেন, বাংলাদেশ তত বেশি প্রস্তুত হামজাকে পাবে। তবে একটি সমস্যা আছে—আসা-যাওয়া। হামজার নতুন ক্লাব যদি ডার্বি কাউন্টি হয়, বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তব সমস্যা থেকেই যাবে – জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনের জন্য দীর্ঘ ভ্রমণ।

সেপ্টেম্বরের শেষদিকে বাংলাদেশকে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ফিফা আসিয়ান কাপে খেলতে হবে। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। ইংল্যান্ডে ক্লাব ফুটবল খেলা একজন খেলোয়াড়ের জন্য ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়া মানে দীর্ঘ বিমানযাত্রা, সময়ের পার্থক্য, ম্যাচের চাপ এবং ফিরে এসে দ্রুত আবার ক্লাব ফুটবলে মানিয়ে নেওয়া। কিন্তু এটিকে শুধু সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন খেলোয়াড়ের জন্য এসব আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পেশাদার ফুটবলেরই অংশ। বরং প্রয়োজন হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনা। হামজার ক্লাবের সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের আগেভাগে যোগাযোগ, ভ্রমণ পরিকল্পনা, জাতীয় দলের শিবিরে যোগ দেওয়ার সময় এবং ফেরার ব্যবস্থা—সবকিছু পেশাদারভাবে করতে হবে।

এখানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। হামজাকে শুধু জাতীয় দলের শিবিরে ডেকে এনে মাঠে নামালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাঁর ক্লাবের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। কখন তিনি ইংল্যান্ড ছাড়বেন, কখন জাতীয় দলের সঙ্গে যোগ দেবেন, কীভাবে ফিরবেন—এসব বিষয় আগে থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ একজন ইংল্যান্ডভিত্তিক পেশাদার ফুটবলারকে দীর্ঘ বিমানযাত্রার পরপরই মাঠে নামিয়ে তাঁর কাছ থেকে সেরা পারফরম্যান্স আশা করা আধুনিক ফুটবল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যায় না।

হামজাকে শুধু জাতীয় দলের তারকা হিসেবে নয়, একজন আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার ফুটবলার হিসেবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এটাই পার্থক্য তৈরি করবে। আরও একটি বড় লাভ—বাংলাদেশের পরিচিতি। হামজার ক্লাব পরিবর্তন বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য মাঠের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ। লেস্টার সিটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং ইংলিশ ফুটবলে তাঁর উপস্থিতি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের ফুটবলকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এনেছে। ডার্বি কাউন্টির মতো ঐতিহ্যবাহী চ্যাম্পিয়নশিপ ক্লাবে গেলে সেই গল্পের আরেকটি অধ্যায় তৈরি হবে।

এতে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় স্তরের ফুটবল নিয়ে আগ্রহ বাড়তে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলাররা দেখতে পাবে – বাংলাদেশের জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড় ইংল্যান্ডের পেশাদার ফুটবলে নিজের জায়গা ধরে রাখার লড়াই করছেন।

এটি ছোট কোনো বিষয় নয়। একজন হামজা হয়তো বাংলাদেশের ফুটবল কাঠামো রাতারাতি বদলে দিতে পারবেন না। কিন্তু তিনি বাংলাদেশি ফুটবলারের সম্ভাবনার সীমাটা মানুষের চোখে আরও বড় করে দিতে পারেন।

হামজার এখন কী করা উচিত?

যদি প্রশ্ন হয়—লেস্টার সিটিতে থেকে সীমিত সুযোগের অপেক্ষা করা, নাকি ডার্বি কাউন্টিতে গিয়ে নিয়মিত খেলার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়া—তাহলে আমি দ্বিতীয় পথটিকেই বেশি যৌক্তিক মনে করি। কারণ হামজার ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে তাঁর মূল্য নির্ধারণ হবে শুধু কোন ক্লাবের সঙ্গে তাঁর চুক্তি রয়েছে, তা দিয়ে নয়। বরং তিনি কত মিনিট খেলছেন, কী দায়িত্ব পালন করছেন এবং কতটা ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছেন—তা দিয়েই।

ডার্বি যদি তাঁকে নিয়মিত চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল খেলার সুযোগ দেয়, তাহলে এটি হামজার ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনরুজ্জীবন হতে পারে। আর বাংলাদেশের জন্য হিসাবটা আরও সহজ। হামজা নিয়মিত খেললে বাংলাদেশ লাভবান হবে। হামজা সুস্থ ও ফিট থাকলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। হামজা আত্মবিশ্বাসী থাকলে বাংলাদেশ লাভবান হবে।

তাই ডার্বি কাউন্টিতে হামজার সম্ভাব্য যোগদানকে শুধু একটি ক্লাব পরিবর্তনের খবর হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি একজন বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক ফুটবলারের ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায়। আর সেই অধ্যায় যদি তাঁকে আবার নিয়মিত মাঠে ফিরিয়ে আনে, তাহলে হয়তো কয়েক মাস পর আমরা বলব—হামজা লেস্টার ছাড়েননি; হামজা তাঁর ক্যারিয়ারের পরবর্তী দরজাটা খুলেছেন।

তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করবে একটি বিষয়ের ওপর—ডার্বি তাঁকে কতটা নিয়মিত খেলায় এবং কোন ভূমিকায় ব্যবহার করে। কারণ হামজার জন্য এখন সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো ক্লাবের নাম নয়।সবচেয়ে বড় অর্জন হবে—আবার নিয়মিত নব্বই মিনিটের হামজাকে ফিরে পাওয়া।

অনুসরণ করুন

অফিসের ঠিকানা: ১ম তলা, আব্দুল আলী প্লাজা, প্রগতি সরণি সড়ক, যমুনা ফিউচার পার্কের আউটগেটের বিপরীতে, ঢাকা-১২২৯।