শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকায় গাড়ি থেকে ১৪ স্বর্ণের বার ও ১২ স্বর্ণের পাত উদ্ধার
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (HSIA) বাইরের গোলচত্বর এলাকায় একটি গাড়ি তল্লাশি করে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধার করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে গাড়ি থেকে ১৪টি স্বর্ণের বার ও ১২টি স্বর্ণের পাতসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের বাইরের গোলচত্বর এলাকায় একটি সন্দেহজনক গাড়ি শনাক্ত করা হয়। পরে গাড়িটিকে তল্লাশির জন্য থামানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে চালক গাড়ি রেখে দ্রুত পালিয়ে যান। গাড়ির চালক হিসেবে মো. শামীম মিয়ার নাম জানা গেছে।
চালক গাড়ি ফেলে পালিয়ে যাওয়ার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সহযোগিতায় গাড়িটিতে তল্লাশি শুরু করেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এয়ারফ্রেইট সার্কেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তল্লাশির একপর্যায়ে গাড়ির ভেতর থেকে ১৪টি স্বর্ণের বার এবং ১২টি স্বর্ণের পাত উদ্ধার করা হয়।
এ সময় উদ্ধার করা স্বর্ণের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, এগুলো অবৈধভাবে পরিবহনের উদ্দেশ্যে গাড়িতে রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে স্বর্ণগুলোর প্রকৃত উৎস, মালিকানা এবং কীভাবে এগুলো গাড়িতে আনা হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্বর্ণ উদ্ধারের পর গাড়িটিতে আরও ব্যাপকভাবে তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশির সময় স্বর্ণের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সামগ্রীও পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি মোবাইল ফোন। এগুলোর মধ্যে একটি নতুন আইফোন ১৭ প্রো এবং দুটি ব্যবহৃত মোবাইল ফোন রয়েছে।
এ ছাড়া গাড়ি থেকে নগদ ১ লাখ ৭ হাজার ৫৮৫ টাকা উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে একটি ব্যবহৃত ল্যাপটপ, বিভিন্ন ব্যাংকের আটটি ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, দুটি ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং একটি জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আরও কিছু আনুষঙ্গিক সামগ্রী পাওয়া যায়।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উদ্ধার হওয়া সব সামগ্রী জব্দ করে সেগুলোর তালিকা বা ইনভেন্টরি প্রস্তুত করেন। পরবর্তীতে গাড়িতে পাওয়া স্বর্ণ, নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ব্যাংক কার্ড, পরিচয়পত্র ও অন্যান্য সামগ্রীর বিস্তারিত হিসাব নথিভুক্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক চোরাচালান ও অবৈধ পণ্য পরিবহন ঠেকাতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিতভাবে নজরদারি চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কৌশলে স্বর্ণ পরিবহনের চেষ্টা করে থাকে। এসব কার্যক্রম প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় সন্দেহজনক যানবাহন এবং ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই গাড়িটি শনাক্ত করা হয় বলে জানা গেছে।
অভিযানের সময় গাড়িচালক পালিয়ে যাওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। গাড়িটি কার নামে নিবন্ধিত, উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ ও অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে কারা জড়িত এবং এগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গাড়িতে পাওয়া বিভিন্ন ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ অন্যান্য নথি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ডিভাইস ও নথি যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের ওজন, বিশুদ্ধতা এবং আনুমানিক বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। একই সঙ্গে উদ্ধার করা অন্যান্য সামগ্রীর বৈধতা ও মালিকানার বিষয়টিও যাচাই করা হবে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গাড়ির চালককে আটক করা সম্ভব হয়নি। তিনি গাড়ি ফেলে পালিয়ে যাওয়ায় তাকে শনাক্ত ও আটকের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গাড়িটির মালিকানা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের পরিমাণ ও অন্যান্য সামগ্রী বিবেচনায় এটি কোনো বড় চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বর্ণগুলো কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় নেওয়া হচ্ছিল—এসব তথ্য উদঘাটন করা গেলে পুরো ঘটনার পেছনে থাকা চক্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া সব পণ্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় জব্দ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ব্যাংক কার্ড ও অন্যান্য নথি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।
এদিকে, বিমানবন্দর এলাকায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। চোরাচালান, অবৈধভাবে স্বর্ণ পরিবহন এবং শুল্ক ফাঁকির মতো অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আরও অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে গাড়ি থেকে ১৪টি স্বর্ণের বার ও ১২টি স্বর্ণের পাত উদ্ধারের ঘটনাটি বিমানবন্দরকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের প্রকৃত মূল্য, উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্ত শেষ হওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
গাড়িচালক পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হলেও, তিনি বা অন্য কোনো ব্যক্তি স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত—এমন সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দেওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হবে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এয়ারফ্রেইট সার্কেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিচালিত এ অভিযানে উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ ও অন্যান্য সামগ্রীর ইনভেন্টরি প্রস্তুত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া গাড়িচালককে শনাক্ত ও আটক এবং এই ঘটনায় সম্ভাব্য অন্য সহযোগীদের খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
