পিরোজপুর: পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলায় প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে জমি দখল, মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও নানা নির্যাতনের অভিযোগ এনে ক্ষতিপূরণ এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন প্রতিবন্ধী দিনমজুর মো. শহিদুল ইসলাম ও তার পরিবার। অভিযুক্তরা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের হোগলাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা। একসময় দিনমজুর হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে তিনি প্রতিবন্ধী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
পরিবারের দাবি, ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া ৪০ শতাংশ এবং ১৯৩০ সালসহ বিভিন্ন সময়ে তাদের পূর্বপুরুষদের ক্রয় করা জমিসহ মোট ১৬৭ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন তারা। পরবর্তীতে কিছু জমি বিক্রি ও এওজ-বদল করার পর বসতভিটাসহ ১২১ শতাংশ জমি তাদের দখলে ছিল।
জানা গেছে, ২০১০ সালে প্রয়াত জামায়াতে ইসলামী নেতা ও পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন প্রতিবেশী মোস্তফা হাওলাদার। এরপর ২০১১ সালে তিনি ওই জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য আদালতে মামলা করেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ২০১২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব খাটিয়ে মোস্তফা হাওলাদার তাদের জমি দখল করেন।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে দুর্বৃত্তদের হামলায় মোস্তফা হাওলাদার নিহত হন। এ ঘটনায় তার ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদার বাদী হয়ে ইন্দুরকানী থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় শহিদুল ইসলামের অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছেলে সোলায়মান হাওলাদারকে তিন নম্বর আসামি করা হয়। একই মামলায় তার ভাই আব্দুর রহিম হাওলাদারকেও আসামি করা হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় এক বছর কারাগারে থাকার পর বিভিন্ন হয়রানির কারণে সোলায়মানের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ২৮ বছর বয়সী সোলায়মান দিনমজুরি ও ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
তাদের অভিযোগ, মোস্তফা হাওলাদারের মৃত্যুর পর তার ভাই রুস্তুম হাওলাদার ও কুদ্দুস হাওলাদার ওই জমির দখল নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে ভোগদখল করছেন। এ সময় জমির গাছ বিক্রি করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং প্রতি বছর ধানি জমি লিজ দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেন তারা।
পরিবারের আরও দাবি, ছেলে দীর্ঘদিন মিথ্যা মামলায় কারাগারে থাকায় শহিদুল ইসলাম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরবর্তীতে তিনবার ব্রেইন স্ট্রোক করে তিনি প্রতিবন্ধী হয়ে যান। বর্তমানে বসতভিটা থেকেও উচ্ছেদের চেষ্টা, মারধর ও বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করেন তারা।
প্রতিবন্ধী শহিদুল ইসলাম বলেন, জমির কাগজপত্র আমাগো আছে, কিন্তু জমি দহল হোইরা ওরা খায়। ওগো কোনো কাগজ নাই। মোর পোলাডারে মিত্যা মামলায় দিয়া, লেহা পরা শ্যাষ হইরা দেছে। এহন মোগো এই ভাঙা ঘর দিয়াও নামাইয়া দেতে চায়। এই জিন্নে ৬-৭দিন আগেও মোরে আর মোর স্ত্রীরে মারছে। এ্যার বিচার চাই।
শহিদুলের বোন রাজিয়া বেগম বলেন, আমার ভাই মিথ্যা মামলায় তার ছেলেকে ফাঁসানো এবং ছেলেকে ধরে নিয়ে মারধরসহ বিভিন্ন নির্যাতনের কারনে সে অসুস্থ হয়ে গেছে। কোন কাজ করতে পারে না। তার হাত পা অবশ হয়ে গেছে, মুখ বাকা হয়ে গেছে। আমরা এসব ক্ষতিপূরন চাই এবং এই অন্যায়ের বিচার চাই।
সোলায়মান হাওলাদার বলেন, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় হত্যা মামলায় আসামি হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। জামিনে বের হওয়ার পরও হয়রানির কারণে আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারিনি। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। বর্তমানে ভাড়ায় অটোরিকশা চালাই, পাশাপাশি দিনমজুরের কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি।
ইউনুস মোল্লা ও মঈনুদ্দিনসহ একাধিক বাসিন্দা বলেন, এই বাড়ি ও জমি প্রতিবন্ধী শহিদুলের পিতা ওহাব আলীসহ তাদের তিন ভাইয়ের বড়োজন এই বাড়ি থাকে। এ বাড়ির জমি সব তাদের। এটা আমরা ছোট বেলা থেকে যানি এবং দেখেছি, আমার বয়স প্রায় ৭০ বছর। কিন্তু এর মধ্যে মোস্তফা আওয়ামীলীগে যোগ দিয়া সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়া, এই জমি গুলো দখল করে খায়। মোস্তফা মারা যাওয়ার পর, এখন তার ভাইরা জমি গুলো দখল করে খায়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত কুদ্দুস হাওলাদার বলেন, আমরা কোনো হামলা বা মারধরের ঘটনা ঘটাইনি। বরং তারাই আমাদের জমির গাছ কেটে নিয়ে গেছে। আদালত যে রায় দেবে, আমরা তা মেনে নেব।
পাড়েরহাট ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, জমি নিয়ে তাদের দু’পক্ষের বিরোধ রয়েছে এটা নিয়ে আমি ইতিমধ্যে সমাধানের চেষ্টা করেছি। বর্তমানে শহিদুলের ওপর হামলার ঘটনা আমি জানিনা, তবে খোজ নিয়ে দেখব। তারা কেউ আমাকে অভিযোগ দিলে পূনরায় সমাধানের চেষ্টা করবো।
ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান বলেন, উভয় পক্ষের পৃথক লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলোর অধিকাংশই দেওয়ানি বিষয় হলেও কিছু অভিযোগ ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে। বিষয়গুলো তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
আরিফ বিল্লাহ , পিরোজপুর।
